পাকিস্তান‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ ঘোষনার বিল মার্কিন কংগ্রেসে

মার্কিন কংগ্রেসে একটি বিল উত্থাপন করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে পাকিস্তান একটি ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ । মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী দুই সদস্য এ বিল উত্থাপন করেন বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া। কাশ্মীর ইস্যুতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার আগে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গতকাল বুধবার রাতে তাঁর এ ভাষণ দেওয়ার কথা।

এদিকে কাশ্মীরের উরি সীমান্তে জঙ্গি হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার দুই দিন পর গত মঙ্গলবার আরেক দফা জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়েছে। এতে ১০ জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এ ছাড়া এক ভারতীয় সেনা নিহত ও দুজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

মার্কিন কংগ্রেসে বিল : টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পাকিস্তান স্টেট স্পন্সর অব টেররিজম ডিসাইনেশন অ্যাক্ট’ শীর্ষক বিলটির নম্বর এইচআর ৬০৬৯। এ নিয়ে চার মাসের মধ্য মার্কিন প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানাতে হবে। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ওবামা বিলটির পক্ষে অথবা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তান সমর্থন দিচ্ছে না তা জানিয়ে একটি প্রতিবেদন ইস্যু করবেন। আর পরবর্তী ৩০ দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি ফলোআপ প্রতিবেদন দেবেন। এতে পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক ঘোষণা অথবা এ ঘোষণা না দিলে কোন আইনে তা করা হবে না তা উল্লেখ করতে হবে।

বিলটিতে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে অনেক উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি মূল্যায়ন প্রতিবেদনকেও (থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট) উদ্ধৃত করা হয়; যাতে আল-কায়েদার সন্ত্রাসী কার্যক্রমে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

বিল উত্থাপন করেন কংগ্রেসের সন্ত্রাসবাদবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান টেড পো এবং পাকিস্তানের বেলুচ জাতিসত্তার শক্তিশালী সমর্থক কংগ্রেসম্যান ডানা রোরাব্যাচার। তাঁরা দুজনই রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেস সদস্য।

গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে কংগ্রেসম্যান টেড পো বলেন, ‘পাকিস্তান কেবল একটি অবিশ্বস্ত মিত্রই নয়, ইসলামাবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের বছরের পর বছর ধরে সাহায্য দিয়ে গেছে। ওসামা বিন লাদেন থেকে শুরু করে হাক্কানি নেটওয়ার্ক—অনেকেরই ঘাঁটি পাকিস্তান। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তান কার পক্ষে, এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্বাসঘাতকতার জন্য এখনই আমাদের পাকিস্তানকে অর্থ দেওয়া বন্ধ করা দরকার এবং তাদের জঙ্গিবাদের মদদদাতা হিসেবে ঘোষণা করা দরকার।’ পৃথক বিবৃতিতে টেড পো কাশ্মীরে উরি সীমান্তে ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে হামলার নিন্দা জানান।

বর্তমানে কংগ্রেসের শেষ সময়ে এই বিল উত্থাপনের ঘটনাটি খুবই সাংকেতিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ মার্কিন কংগ্রেসে হাজার হাজার বিল উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে খুব কমই আইনের স্বীকৃতি পায়। কিন্তু এ বিল আইনে পরিণত না হলেও পাকিস্তানের বিষয়ে মার্কিন আইন প্রণেতাদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।

উরিতে অনুপ্রবেশকালে ১০ ‘জঙ্গি’ নিহত : কাশ্মীর সীমান্তের উরিতে গত রবিবার সেনাঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে জঙ্গিরা ১৮ ভারতীয় সেনাকে হত্যার দুই দিন পর আবারও জঙ্গি হামলা হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে ওই হামলায় ১০ জঙ্গি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ সময় ভারতের এক সেনা সদস্য নিহত ও দুজন আহত হন।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, মঙ্গলবার উরি সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অতর্কিতে গুলি চালায়। প্রায় ২০টি গুলিবর্ষণ করে তারা। এ সময় পাল্টা গুলি ছোড়ে ভারতীয় বাহিনী। মূলত পাকিস্তানি বাহিনী জঙ্গিদের অনুপ্রবেশের সুযোগ দিতে অতর্কিতে এই হামলা চালায়। এ সময় ১৫ জনের একটি জঙ্গি দল লচ্ছিপোড়া সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করে। তবে ভারতীয় বাহিনীর তত্পরতায় এবার জঙ্গিদের রুখে দেওয়া সম্ভব হয়। এ সময় ভারতীয় বাহিনীর পাল্টা হামলায় ১০ জন নিহত হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অভিযানের সময় প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত রবিবার উরিতে হামলার জন্য ভারত পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদকেই সন্দেহ করছে। একই সঙ্গে তাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী সহযোগিতা দিয়েছে বলেও অভিযোগ করে আসছে। পাকিস্তান এই দোষারোপকে ‘উসকানিমূলক’ বলে দাবি করে আসছে। রবিবারের ওই হামলার পর থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী-সেনাপ্রধান আলোচনা : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গতকাল রাতে ভাষণ দেওয়া কথা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের। এতে তিনি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভারত-পাকিস্তান সমস্যার সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চাইবেন। এই ভাষণ দেওয়ার আগে নওয়াজ শরিফ গতকাল তাঁর দেশের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। নওয়াজ কাশ্মীর পরিস্থিতির ভয়াবহতার জন্য ভারতকে দায়ী করে ভাষণ দিতে পারেন বলে ধারণা রয়েছে।

কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার আগে নওয়াজ শরিফ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বিষয়টি তুলেছেন। জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে এই বৈঠকে তিনি জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গে আলোচনায় কাশ্মীর সমস্যার সমাধান পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন।

নরেন্দ্র মোদির বৈঠক : উরি হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গতকাল মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর ও অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা জানা যায়নি।

অন্যদিকে উরি হামলার পর কাশ্মীরের পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করার জন্য গতকাল উরিতে যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব রাজীব মেহঋষি। পরিদর্শনকালে তিনি কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া, আনন্দবাজার

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password