প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সফরে যাচ্ছেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। তার দুই দেশ সফর হবে ১২ দিনের। আগামী বুধবার (১৪ই সেপ্টেম্বর) তিনি ঢাকা থেকে রওনা করবেন। প্রধানমন্ত্রী কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পথে লন্ডনে এক রাত যাত্রা বিরতি করবেন।

গতকাল মন্ত্রণালয়ে আনক্লজ সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়- প্রথম পর্বে ‘ফিফথ রিপ্লেনিসমেন্ট কনফারেন্স অব দ্য গ্লোবাল ফান্ড (জিএফ)’-এ যোগদানের উদ্দেশে ১৫ থেকে ১৮ই সেপ্টেম্বর ৪ দিন প্রধানমন্ত্রী কানাডা সফর করবেন। এরপর সফরের দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮ থেকে ২৫শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাবেন।

এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের লক্ষ্যে ১৬ ও ১৭ই সেপ্টেম্বর কানাডার মন্ট্রিলে ‘জিএফ’র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ৯টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ছাড়াও জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের তিনটি সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ রোগ- এইডস, যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়ার বিস্তার রোধে আরো বেশি উদ্যোগ গ্রহণে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ওই মঞ্চে কথা বলবেন।

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর খুনি নুর চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা করবেন। এছাড়া বাণিজ্য-বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে দুই সরকার প্রধানের মধ্যে আলোচনা হবে বলে জানান মন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য ২০১২ সালে জাস্টিন ট্রুডোর বাবা পিয়েরে ট্রুডোকে বাংলাদেশ সম্মাননা প্রদান করেছিল। কানাডা সফরকালে জাস্টিন ট্রুডোর হাতে সেই সম্মাননাটি তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মন্ত্রী বলেন, কানাডা বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম একটি দেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এই দেশটি আমাদেরকে প্রত্যক্ষ সমর্থন জানিয়েছিল। তাছাড়া, নব্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে কানাডা সবসময়ই পাশে থেকেছে। কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘে আমাদের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রেও এই দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসূচি: ১৮ই সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে এয়ার কানাডার একটি ফ্লাইটযোগে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে মন্ট্রিল ত্যাগ করবেন। এই ফ্লাইটটি নিউ ইয়র্কের লা গার্ডিয়া বিমানবন্দরে বিকাল ৩টায় (নিউ ইয়র্ক সময়) পৌঁছার কথা। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন। পরে প্রধানমন্ত্রীকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে নিউ ইয়র্কের হোটেল ওয়ার্ল্ডোফ অস্টোরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। নিউ ইয়র্কে অবস্থানকালে তিনি এ হোটেলেই থাকবেন।

শেখ হাসিনা ১৯শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে উদ্বাস্তু ও অভিবাসনের ওপর সাধারণ পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের প্লিনারি বৈঠকে ভাষণ দেবেন। তিনি ‘গ্লোবাল কমপেক্ট ফর সেফ, রেগুলার অ্যান্ড ওর্ডালি মাইগ্রেশন : টেকসই উন্নয়নবিষয়ক এজেন্ডা-২০৩০ বাস্তবায়ন এবং অভিবাসীদের মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা অর্জনবিষয়ক রাউন্ড টেবিল-৫ এ যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন। প্রধানমন্ত্রী ২০শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনের সাধারণ আলোচনার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।

তিনি পরে হোটেল ম্যারিয়ট ইস্টসাইডে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে আয়োজিত কাউন্টার টেরোরিজমের ওপর এশিয়ান লিডার্স ফোরামের বৈঠকে যোগ দেবেন। শেখ হাসিনা মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আয়োজিত উদ্বাস্তু বিষয়ক এক বৈঠকে যোগ দেবেন। ২১শে সেপ্টেম্বর সুইডিস প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন লো ভেশ আয়োজিত ডিসেন্ট ওয়ার্ক অ্যান্ড ইক্লুসিভ গ্রোথ বিষয়ক সোশ্যাল ডায়ালগ সংক্রান্ত গ্লোবাল ডিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন। তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুমে পানিবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের এক প্যানেল বৈঠকে যোগ দেবেন। প্রধানমন্ত্রী ওইদিন বিকালে জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনের সাধারণ আলোচনায় বক্তব্য রাখবেন। তিনি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের দেয়া এক সংবর্ধনা সভায় এবং হোটেল ওয়ার্ল্ডোফ অস্টোরিয়ায় বিজনেস কাউন্সিল অব ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং (বিসিআইইউ) আয়োজিত এক ভোজসভায় যোগ দেবেন।

শেখ হাসিনা ২১শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে হোটেল গ্রান্ড হায়াতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন এবং ২২শে সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেয়ার পাশাপাশি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচি, সুইস প্রেসিডেন্ট জোহান চেনিডার আম্মান এবং কমনওয়েলথ মহাসচিব ও ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসতে পারেন। তবে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী মাহমুদ আলী সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কারো সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সাইড লাইন বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করতে পারেননি। বলেন, সুইডেনের প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২২শে সেপ্টেম্বর সড়ক পথে ভার্জিনিয়ার উদ্দেশ্যে নিউ ইয়র্ক ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৫শে সেপ্টেম্বর এমিরেটস এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে দেশের উদ্দেশে ওয়াশিংটন ডিসির ডুলেস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ত্যাগ করবেন তিনি। ফ্লাইটটি দুবাই হয়ে ২৬শে সেপ্টেম্বর বিকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে তিনি ৭০ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধি দল এবং নিজ খরচে শতাধিক ব্যবসায়ী প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন বলে জানা গেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যে আইএসসহ বিশ্বব্যাপী সহিংস জঙ্গি তৎপরতার উত্থান এবং ঢাকা, প্যারিস, ব্রাসেলস, ইস্তাম্বুল, বাগদাদ, মদিনা, জাভা, পুচংসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের আওতায় আরো কার্যকর প্রয়াস গ্রহণের বিষয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ সচেষ্ট থাকবেন। একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিময় পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে গত বছর জাতিসংঘের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক বেশকিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। এবারের অধিবেশনে উল্লেখযোগ্য এই কর্মপরিকল্পনাসমূহের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি ও প্রাথমিক অগ্রগতি বিষয়ে আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রী শীর্ষ পর্যায়ের সব বৈঠকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন।

২১শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বক্তৃতা দেবেন। সেই বক্তৃতায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন, অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার আদায়, দারিদ্র্য দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা তুলে ধরবেন। একই সঙ্গে তিনি ২০৩০-এর ভিশন বাস্তবায়নে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। ‘রূপকল্প-২০২১’-এর আলোকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার যে ইতিমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে, সে বিষয়েও তিনি আলোকপাত করবেন এবং এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরবেন।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে অবস্থানরত মিয়ানমার শরণার্থী ও অনিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিক সম্পর্কিত সমস্যাটির একটি স্থায়ী, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের বিষয়টিও তুলে ধরবেন। তিনি সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ভিত্তিক আপোষহীন নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করবেন। এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরো সুসংহত করবে বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password