দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী সংঘর্ষ, হয়রানি

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আইনবহির্ভূত কাজ করার অপরাধে খুলনার অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও কলারোয়া পৌরসভা নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার মো. আবুল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কমিশন। গতকাল রবিবার দুপুরের দিকে এ-সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করেন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মো. সাবেদ উর রহমান।

একই দিন নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভা নির্বাচনের প্রচারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ মেয়র প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের গোপালপুর ও ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বিএনপি প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে। এসব সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ১০ জন। খুলনার পাইকগাছা ও চালনা পৌরসভায় শাসকদলের নেতাকর্মীরা মোবাইল ফোনে হুমকি, মামলায় গ্রেপ্তারসহ বিভিন্নভাবে ভয় দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী শেখ মোহাম্মদ নুরুন্নবী অপু ও তাঁর আত্মীয়স্বজন, কর্মী-সমর্থকদের বাড়িতে তল্লাশির নামে হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় গতকাল গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনিছুর রহমানকে আবারও কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ঢাকা ও ঢাকার বাইরের আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর : নির্বাচন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত : নির্বাচন কমিশনের আদেশে বলা হয়েছে, খুলনার অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আবুল হোসেন সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভা নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও আইনবহির্ভূত কাজ করেছেন। তিনি আইনবহির্ভূতভাবে কলারোয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলামের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন। যাতে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ হয়েছে।

আদেশে আরো বলা হয়, উপজেলা পরিষদের কোনো পদে থেকে কোনো মনোনয়ন প্রত্যাশীর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা যায় না। আবুল হোসেন শুধু মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেননি, তাঁকে বৈধ প্রার্থী হিসেবেও ঘোষণা করেন। এর আগে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় আবুল হোসেনকে তাত্ক্ষণিক প্রত্যাহার করে নিয়ে গত সোমবার বাগেরহাটে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার সকালে তিনি মাগুরা থেকে আসা নবাগত জেলা নির্বাচন অফিসার আহম্মেদ আলীর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।

হাতিয়ায় (নোয়াখালী) সংঘর্ষ : গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে হাতিয়া পৌরসভার চৌমুহনী বাজারে আওয়ামী লীগ ও দলটির ‘বিদ্রোহী’ মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে আছেন উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সায়েদ আহমেদ (২৮), আওয়ামী লীগ কর্মী মনিরুল ইসলাম সোহেল (৩৩), বাহার উদ্দিন (৩০) ও মাঈন উদ্দিন (২৯)। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দলীয় মেয়র প্রার্থী ইউছুফ আলী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাইফ উদ্দিনের লোকজন পৌরসভার ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রচার চালাচ্ছিল। এ সময় উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে বাগিবতণ্ডার একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেধে যায়। আহত বাহার উদ্দিন দাবি করেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাইফ উদ্দিনের লোকজন তাঁদের ওপর অতর্কিতে হামলা করেছে।

তবে দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাইফ উদ্দিন বলেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থক নহেলের নেতৃত্বে কয়েকজন সন্ত্রাসী স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থীর ভাই মাইন উদ্দিনকে মারধর করে। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে স্থানীয় লোকজনের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। পরে ওই সন্ত্রাসীরা চৌমুহনী বাজারে জহিরের মুদি দোকান ভাঙচুর করে।

সংঘর্ষের পর ছাইফ উদ্দিন তাঁর বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, তাঁর নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়া হয়েছে। মারধর করা হয়েছে তাঁর সমর্থকদের। হাতিয়া থানার ওসি নুরুল হুদা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর লোকজনের ওপর বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

বিএনপি প্রার্থীদের ওপর হামলা : গতকাল সন্ধ্যায় টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌরসভায় বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম রুবেলের ওপর আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর লোকজন হামলা চালায়। এর আগে তাঁর কর্মী সভায় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা হামলা চালিয়ে টেবিল-চেয়ার ভাঙচুর করে। এতে রুবেলসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে বিএনপির দাবি। অন্যদিকে বিএনপি কর্মীদের হামলায় আওয়ামী লীগ কর্মী সাবেক কাউন্সিল মাসুম আহত হয়েছেন।

গোপালপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম জানান, বিকেলের দিকে পালপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পাশে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর প্রচার সভা ছিল। সেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন গিয়ে হামলা চালিয়ে টেবিল-চেয়ার ভাঙচুর করে। সভা শেষ করে ফেরার পথে বিএনপির মেয়র প্রার্থী খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম রুবেলের বহরে হামলা চালায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন। এ খবর শুনে বাজার এলাকায় আওয়ামী লীগ কর্মী মাসুমের ওপর স্থানীয় লোকজন ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বলে তিনি দাবি করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হালিমুজ্জামান বলেন, মাসুমের ওপর হামলার প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সভা হয়েছে।

এ ব্যাপারে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হবে বলেও তিনি জানান। গোপালপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দিদারুল ইসলাম বলেন, মিছিল নিয়ে দুই দলের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তবে কোনো মারামারির ঘটনা ঘটেনি।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌর নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী খলিলুর রহমানের ওপর একদল যুবক হামলা চালিয়ে তাঁর মোটরসাইকেল ভাঙচুর এবং তিন সমর্থককে মারধর করে আহত করেছে। চতুরা গ্রামে বিএনপি মেয়র প্রার্থীর নিজস্ব ইটভাটায় এ হামলার ঘটনা ঘটে। খলিলুর রহমান বলেন, ‘দুপুর আড়াইটার দিকে চতুরা গ্রামে আমার নিজের ইটভাটায় আমি কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বসে ছিলাম। এ সময় ১০-১২ জনের একদল যুবক আমাদের ওপর হামলা চালায়।’

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আওয়ামী লীগের আশরাফুল আজমের লোকজন এই হামলা চালিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে এ ব্যাপারে আশরাফুল আজমের দাবি, তাঁর কর্মী-সমর্থকদের ওপরই হামলা করেছে খলিলের লোকজন। শৈলকুপা থানার ওসি তোজাম্মেল হক জানান, এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি।

হয়রানি ও হুমকির অভিযোগ : জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ মেয়র প্রার্থী নুরুন্নবী অপু অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. শাহনেওয়াজ শাহান শাহ তাঁর সমর্থকদের প্রচারকাজে বাধা, নানা হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছেন। তাঁর ১২ জন কর্মীকে মারধর করা হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ প্রার্থী সশস্ত্র কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রতিদিন ৩০-৪০টি মোটরসাইকেলে করে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গ্রাম, মহল্লা ও বাজারে মহড়া দিচ্ছেন।

ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। গতকাল জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে দেওয়া অভিযোগে তিনি বলেন, গোয়েন্দা পুলিশ তল্লাশির নামে তাঁকে ও তাঁর আত্মীয়স্বজন, কর্মী-সমর্থকদের হয়রানি করছে। অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহনেওয়াজ শাহান শাহ বলেন, নৌকা প্রতীকের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী নুরুন্নবী অপু মিথ্যা অভিযোগ করছেন, অপপ্রচার চালাচ্ছেন। গোয়েন্দা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যাপারে জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শরীফুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযোগ হাতে পাইনি। পেলে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গতকাল দুপুরে খুলনায় দলীয় কার্যালয়ে পাইকগাছা ও চালনা পৌরসভা নির্বাচন পরিচালনা সমন্বয় কমিটির সভায় বিএনপি নেতারা এ অভিযোগ করেন। সভায় তাঁরা বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ কোথাও কোথাও বিএনপি নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারের ভয় দেখাচ্ছে।

শ্রীপুরে আ. লীগের মেয়র প্রার্থীকে আবারও শোকজ : আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে গতকাল সন্ধ্যায় গাজীপুরের শ্রীপুর পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনিছুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর এক দিন আগে গত শুক্রবার একই অভিযোগে আওয়ামী লীগের ওই প্রার্থীকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছিল কমিশন।

এর আগে বিকেলে আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় আট নম্বর ওয়ার্ডের দুই কাউন্সিলর প্রার্থী আবদুল বারেক (ডালিম) ও ফিরোজ আহমেদকে (উটপাখি) কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

রিটার্নিং অফিসার মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানান, আওয়ামী লীগের মেয়র পদপ্রার্থী বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত শ্রীপুর পৌর শহরে তাঁর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মিছিল ও শোভাযাত্রা করেছেন। ওই সময় মাওনা-গোসিংগা সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। তাঁকে নোটিশ পাওয়ার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে ।

বাংলাদেশ সময় : ০৯১৮ ঘন্টা, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৫

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password