ডিজিটাল ক্যামেরা হারিয়ে যাচ্ছে?

বাণিজ্য ডেস্ক :

২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে গ্রাহকদের ছবি তোলার আগ্রহের ওপর একটি জরিপ চালায় ক্যামেরা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফুজিফিল্ম। জরিপে উঠে আসে ফিল্ম দিয়ে ছবি তোলার যুগে গ্রাহকেরা যেখানে ১০ হাজার কোটি ছবি তুলেছেন, সেখানে ডিজিটাল ক্যামেরার যুগে ছবি তোলা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের ছবি তোলার প্রবণতা যে বেড়েছে, জরিপটি তারই প্রমাণ। তবে মজার ব্যাপার হলো, ডিজিটাল যুগের বেশির ভাগ ছবিই স্মার্টফোনে তোলা।

এবার আমেরিকার উদাহরণ দেওয়া যাক। দেশটির বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইএ মার্কেট রিসার্চের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১১ সালে আমেরিকায় যত ছবি তোলা হয়, এর ৩৭ শতাংশই হয়েছে মোবাইলের ক্যামেরায়। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে।

অবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ায় ক্যানন, নাইকন, অলিম্পাস, সনি, ফুজিফিল্ম ও প্যানাসনিকের মতো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল ক্যামেরার (বিশেষ করে কমপ্যাক্ট ক্যামেরা) দাম অনেক কমিয়ে দিয়েছে। তাতেও রক্ষা হচ্ছে না। স্মার্টফোনের বিল্ট-ইন ক্যামেরার কারণে আলাদা করে ক্যামেরা কিনতে এখন অনেকেই আগ্রহী নন।

এখনকার স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটগুলোর ক্যামেরার মানও বেশ উন্নত। সে কারণেই বিশ্বজুড়ে এখন ক্যামেরার বিক্রি কমছে। আর ছবি তোলার মাধ্যম হয়ে উঠেছে স্মার্টফোন।

যে স্মার্টফোন দিয়ে কথা বলা এবং গান শোনা যাচ্ছে, সেই একই মোবাইলে ভালো ছবিও তোলাও যাচ্ছে। কারও পকেটেই যখন ভালো মানের একটি ক্যামেরা থাকে, তিনি কি আর ১০-১৫ হাজার টাকা খরচ করে আরেকটি ডিজিটাল ক্যামেরা কিনবেন?
প্রযুক্তি খাত নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন (আইডিসি) বলছে, ২০১৩ সালে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের রপ্তানি ১০০ কোটি ছাড়ায়।

এ বছর তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৪৪ কোটিতে, যা আগের বছরের চেয়ে ১১ শতাংশ বেশি। আর সংস্থাটির পূর্বাভাস হলো ২০১৯ সালে স্মার্টফোনের রপ্তানি হবে প্রায় ২০০ কোটি ছুঁই ছুঁই।

তবে ২০১৯ সাল নাগাদ ডিজিটাল ক্যামেরার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে পূর্বাভাস না করলেও চলবে। কারণ টোকিওভিত্তিক ক্যামেরা অ্যান্ড ইমেজিং প্রডাক্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিআইপিএ) এরই মধ্যে পূর্বাভাস করেছে যে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী রপ্তানি হতে পারে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডিজিটাল ক্যামেরা।

এটি আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। অথচ, ২০১২ সালেও সারা বিশ্বে ৯ কোটি ৮১ লাখ ডিজিটাল ক্যামেরা রপ্তানি হয়। অর্থাৎ দুই বছরেই রপ্তানি অর্ধেকে নেমেছে।

কেন সাধারণ মানুষের হাত থেকে ডিজিটাল ক্যামেরা হারিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় যে কারণটি উঠে এসেছে, তা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। নিজের ছবি অন্যকে দেখানোর বড় দুটি মাধ্যম হলো ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম।

ক্যামেরায় ছবি তুলবেন, সেই ছবি কম্পিউটারে নামাবেন, তারপর ফেসবুকে আপলোড করবেন, এত সময় কোথায়। এত ঝামেলায় না গিয়ে মানুষ এখন স্মার্টফোনে ছবি তুলে সঙ্গে সঙ্গেই তা আপলোড করছে। .আর স্মার্টফোনে তোলা ছবির মানও বেশ ভালো। এখন ১৩-১৬ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার মোবাইল ফোন পাওয়া যাচ্ছে অহরহ। এমনকি ৪১ মেগাপিক্সেল ক্যামেরার স্মার্টফোনও আছে নকিয়ার (নকিয়া লুমিয়া ১০২০)।

ডিজিটাল ক্যামেরার ব্যবসায় বিশ্বব্যাপী যে ধাক্কা লেগেছে, তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। দেশেও কমেছে ক্যামেরার বিক্রি। তবে ডিএসএলআর ক্যামেরা ভালোই বিক্রি হচ্ছে।

স্যামসাং ইলেকট্রনিকস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং কমিউনিকেশন) মাশরুর হাসান বলেন, ‘স্মার্টফোনের কারণে আমাদের ক্যামেরা বিক্রি অনেক কমে গিয়েছিল। সে কারণে ২০১৪ সালের প্রথমার্ধের পর থেকে বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের ক্যামেরা আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর আমাদের কোনো শোরুমেই ক্যামেরা বিক্রি হচ্ছে না।’

দেশে ক্যাননের ক্যামেরা বাজারজাত করে জেএএন এবং নাইকনের ক্যামেরা বাজারজাত করে ফ্লোরা লিমিটেড। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের কমপ্যাক্ট ডিজিটাল ক্যামেরার বিক্রি ৮০ শতাংশ কমে গেছে। তবে ডিএসএলআর ক্যামেরা এখনো বিক্রি হয়।
বড় ক্যামেরা প্রস্তুতকারীদের কী হাল: বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি ডিজিটাল ক্যামেরা বিক্রি হয় ক্যাননের। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা, এ বছর তাদের ডিজিটাল ক্যামেরার রপ্তানি কমবে আগের বছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ। এবার প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ২৮ লাখ ক্যামেরা রপ্তানি করতে চায়। রপ্তানি কমে যাওয়ায় বছর শেষে পরিচালন (অপারেটিং) মুনাফা ৪ শতাংশের বেশি কমে যায় কি না, তা নিয়ে সন্দেহে আছে ক্যানন কর্তৃপক্ষ।

আরেক বড় ক্যামেরা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নাইকন। এই প্রতিষ্ঠানটিও এ বছর ১৭ শতাংশ রপ্তানি কমে যাবে বলে ধারণা করছে। তবে তাদের পরিচালন মুনাফা কমবে প্রায় ৩৩ শতাংশ।

একসময়ের ক্যামেরার বাজারে সুপরিচিত নাম অলিম্পাস ২০১৪ সালে প্রায় ১৩৮ কোটি ইয়েন লোকসান গুনেছে। তবে এ বছর কোনো লোকসান হবে না বলে মনে করে কর্তৃপক্ষ। কারণ তারা কয়েক ধরনের ক্যামেরার উৎপাদনই বন্ধ করে দিয়েছে। তেমনি বেছে বেছে কয়েকটি দেশে ক্যামেরা রপ্তানি করছে।

ফুজিফিল্ম কর্তৃপক্ষের ধারণা, এ বছর তাদের ক্যামেরা বিক্রি ৩৬ শতাংশ কমবে। তবুও প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে তাদের মুনাফা হবে। কারণ তারা এখন কম দামের ক্যামেরার চেয়ে বেশি দামের উচ্চমানসম্পন্ন ক্যামেরা প্রস্তুত ও বিপণনে মনোযোগী হয়েছে।
প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্মার্টফোনের দাপটে টিকতে হলে এখন নতুন নতুন প্রযুক্তি আনতেই হবে ক্যামেরা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

সেদিকটি মাথায় রেখে এরই মধ্যে ফুজিফিল্ম, অলিম্পাস ও প্যানাসনিকের মতো প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে আয়নাবিহীন বিশেষ একধরনের ক্যামেরা বাজারে আনে। কিন্তু এতেও খুব একটা লাভ হয়নি। ২০১৩ সালে এক প্রতিবেদনে অলিম্পাস জানায়, এই ক্যামেরা আনার পর প্রথম প্রান্তিকেই তাদের আয়নাবিহীন ছোট ক্যামেরার বিক্রি কমেছে ১২ শতাংশ।

-প্রথম আলো

বাংলাদেশ সময়: ১৩১০ ঘণ্টা, ২৪ অক্টোবর,২০১৫

Login

Welcome! Login in to your account

Remember me Lost your password?

Lost Password